রবিবার ১৪ জুন ২০২৬
Online Edition

ধৈর্য সকল কল্যাণ ও সফলতার চাবিকাঠি

আবদুল হালীম খাঁ : ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় যারা জীবনে বড় বড় ভালো কাজ করেছেন, জ্ঞানবিজ্ঞান শিল্পসাহিত্য ও রাজনীতিতে সফলতা লাভ করে অশেষ যশঃখ্যাতি লাভ করেছেন তারা সবাই ধৈর্যের মাধ্যমে তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।
ধৈর্যের আভিধানিক অর্থ হলো সকল প্রকার বিপদ আপদে বা পার্থিব বালামুছিবতে কিংবা কোনো অন্যায় অত্যাচার, দুঃখ কষ্টে, রোগ শোকে, ক্ষুধা-তৃষ্ণায়, যুদ্ধজিহাদ-পরাজয়ে বিচলিত না হয়ে এবং মেজাজের ভারসাম্য না হারিয়ে, আনন্দ সুখে আত্মহারা না হয়ে মহান আল্লাহর উপর নির্ভর করে সব কিছু সহ্য করে অটল অবিচল থাকাকেই ধৈর্য বলা হয়। যে ব্যক্তি এ মহত গুণে গুণান্বিত তাকে ধৈর্যশীল বলা হয়।
পৃথিবীতে দিনরাতের আলো আঁধারের মতো সত্য মিথ্যা, ন্যায় অন্যায় ও হক বাতিলের দ্বন্দ্ব সংঘাত চিরন্তন। সত্যপন্থী মানুষ তার উদ্দেশ্যও লক্ষ্য পথে চলতে গেলেই এক সময় বাতিলের বাঁধার সম্মুখীন হবে। তার চলার পথ রোধ করে দাঁড়াতে। জানমালের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হবে, এ অবস্থায় তাকে হতাশ বা তাড়াহুড়া করলে চলবে না। তাবে অবশ্য ধৈর্য ধারণ করতে হবে। ধৈর্য ধারণ করা মানে থেমে যাওয়া নয়, নিঃচেষ্ট হয়ে বসে থাকা নয়, বাতিল শক্তির কাছে মাথা নত করা নয়। বরং বাঁধা অতিক্রম করে গন্তব্য স্থলে পৌঁছার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
এ ব্যাপারে এখানে একটি হাদীস উল্লেখ করা যায়। হাদীসটির বক্তব্য থেকে ধৈর্যÑধারণের তাৎপর্য উপলব্ধি করা সহজ হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমার সামনে কোনো অন্যায় হতে দেখলে তা হাত দ্বারা বন্ধ করবে। হাত দ্বারা বন্ধ করার শক্তি না থাকলে মুখ দ্বারা তার প্রতিবাদ করবে। আর মুখ দ্বারা প্রতিবাদ যদি না করতে পারো তবে অন্তর দিয়ে সে অন্যায় বন্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
এ হাদীস থেকে বুঝা যায় কোনো অন্যায় মেনে নেয়া যাবে না। অন্যায় বন্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। নিঃচেষ্ট বসে থাকা যাবে না। আর এ অন্যায় প্রতিরোধের চেষ্টা অব্যাহত রাখার জন্য ধৈর্য-ধারণ করতে হবে। ধৈর্যহারা হয়ে অস্থির হওয়া যাবে না।
বিপদ আপদ মুছিবতে, শোক দুঃখ কষ্ট রাজয়ে ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে এবং তাঁর উপর নির্ভর করতে হবে। মহান আল্লাহর নির্দেশ : হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য কামনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন। (সূরা বাকারা ১৫৩)
সূরা আল ইমরানে ইরশাদ হয়েছে : হে ঈমানদারগণ তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং বাতিলপন্থীদের মুকাবিলায় দৃঢ়তা দেখাও। হকের খেদমত করার জন্যে উঠে পড়ে লাগো এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। আশা করা যায়, তোমরা সফল কাম হবে। (সূরা আল ইমরান ২০০)
আরো ইরশাদ হয়েছে : হে ঈমানদারগণ, তোমরা যখন কোনো বাহিনীর সাথে সংঘাতে লিপ্ত হবে, তখন সুদৃঢ় থাকবে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করবে, যাতে তোমরা সফলকাম হও। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে। তাছাড়া তোমরা পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হবে না। যদি তা করো, তাহলে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে, আর তোমরা ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন। (সূরা আনফাল ৪৫-৪৬)
ধৈর্যের সঙ্গে রাগ এবং রাগের সঙ্গে ধৈর্যের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। রাগ দমন করে না রাখলে ধৈর্য-ধারণ সম্ভব হয় না। রাগ মানুষের হুশহারা করে আর হুশহারা হলে সঠিক কাজের সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। হযরত আবুহুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। একদা এক ব্যক্তি নবী করীম (সা.) এর কাছে নিবেদন করলো, হে রাসূল (সা.) আমাকে উপদেশ দিন। রাসূল (সা.) বললেন, তুমি রাগ করবে না। লোকটি বার বার একই প্রশ্ন করলো এবং রাসূল (সা.) বার বার তাকে জবাব দিলেন যে, তুমি রাগ করবে না। (সহীহ বুখারী)
মানুষের জীবনে কখনো অখ- সুখ ও সুদিন থাকে না। সুখের পরে আসে দুঃখ, কষ্ট, শোক, আসে ক্ষয়ক্ষতি, আসে ভয়ভীতি, আসে ক্ষুধা যন্ত্রণা আরো নানা রকম অসুবিধে। এ সব কঠিন মুহূর্তে যারা ধৈর্য ধারণ করে তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ।
মহান আল্লাহ বলেন : আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো কিছুটা ভয়ভীতি, ক্ষুধা, জানমালের ক্ষতি ও ফসল ফল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পড়ে, তখন বলে : নিশ্চয়ই আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁর দিকে ফিরে যাবো। (সূরা আল বাকরা ১৫৫-১৫৬)
সূরা আল আসরে মহান আল্লাহ বলেছেন, চারটি গুণের অধিকারী ব্যতীত সকল মানুষই ক্ষতির মধ্যে পতিত। সে চারটি গুণ à¦¹à¦²à§‹Ñ à§§. যে ঈমান এনেছে, ২. যে ঈমান আনার পর সৎ কাজ করে, à§©. পরস্পরকে সত্যের তাগিদ দেয় এবং ৪. পরস্পরকে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেয়।
বস্তুত মুমিনের সমগ্র জীবনই ধৈর্যের জীবন। ঈমানের পথে পদক্ষেপ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তার ধৈর্যের প্রয়োজন। আল্লাহর আদেশ নিষেধসমূহ পালন করার জন্য ধৈর্য অপরিহার্য। আল্লাহর হারাম করা জিনিস বা কাজ থেকে বিরত থাকা ধৈর্য ছাড়া সম্ভব নয়। ধৈর্য থাকলে অপরাধ ও পাপ কাজগুলো পরিহার এবং পবিত্রতা ও নৈতিকতা অবলম্বন সম্ভব হয়। সংসার জীবনে প্রতি পদে পদে যে পাপের আকর্ষণ মানুষকে হাতছানি দেয়,তা থেকে নিজকে দূরে রাখা এই ধৈর্যের বলেই সম্ভব। জীবনে এমন অনেক সময় আসে যখন আল্লাহর আইন মানতে গেলে দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ ও বঞ্চনাকে আলিঙ্গন করতে হয়। পক্ষান্তরে আল্লাহর নাফরমানির পথ অবলম্বন করলে প্রচুর লাভ স্বার্থ, আনন্দ সুখ সুবিধে লাভ করা যায়। এসব ক্ষেত্রে ধৈর্য ছাড়া কোনো মুমিনই নিজকে রক্ষা করতে পারে না।
তাই একজন মুমিনের পার্থিব জীবনে যাবতীয় অন্যায়-ফ্যাসাদ থেকে বাঁচার এবং পারলৌকিক জীবনের সকল কল্যাণ ও সফলতা লাভের একমাত্র চাবিকাঠি হলো ধৈর্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ